ভারতীয় উপমহাদেশে নির্বাচনের ইতিহাস বেশ পুরনো এবং এটি বিভিন্ন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। উপমহাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে প্রধানত ব্রিটিশ শাসনামল, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর নির্বাচন প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
১. ব্রিটিশ শাসনামল (১৭৫৭ – ১৯৪৭)
ভারতীয় উপমহাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থার সূচনা হয় ব্রিটিশ শাসনামলে। ব্রিটিশ শাসকরা স্থানীয় প্রশাসনের জন্য কিছু নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করেন। যদিও এগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সীমিত এবং অগণতান্ত্রিক ছিল, তবে এটি পরবর্তী সময়ের গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ভিত্তি গড়ে তোলে।
- ১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইন: এটি ব্রিটিশ সরকারের সরাসরি শাসনের আওতায় ভারতকে নিয়ে আসে, তবে এটি কোনো গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ধারণা প্রতিষ্ঠা করে না।
- ১৯১৯ সালের মণ্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার: এই আইনের অধীনে প্রাদেশিক পর্যায়ে আংশিক নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু হয় এবং স্থানীয় প্রশাসনে ভারতীয় প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়।
- ১৯৩৫ সালের ভারত সরকার আইন: এই আইনটি কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক স্তরে নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করার পথ প্রশস্ত করে। এটি ছিল ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথমবারের মতো বেশ বড় পরিসরে নির্বাচনের প্রচলন।
২. ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা
১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর উপমহাদেশটি দুটি পৃথক রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তিনটি স্বাধীন দেশ হিসেবে ভারতের উপমহাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত হয়।
- ভারত: ১৯৫০ সালে ভারতের সংবিধান কার্যকর হলে গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫২ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা ছিল বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক নির্বাচন।
- পাকিস্তান: পাকিস্তানে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) এবং ১৯৭০ সালে পাকিস্তানজুড়ে প্রথমবারের মতো সারা দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- বাংলাদেশ: ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালে। বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা তার স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকেই একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিকশিত হতে থাকে।
৩. পরবর্তী নির্বাচন ব্যবস্থা
ভারতীয় উপমহাদেশের তিনটি রাষ্ট্র—ভারত, পাকিস্তান, ও বাংলাদেশ—নিজ নিজ নির্বাচন ব্যবস্থাকে উন্নত ও পরিশীলিত করার চেষ্টা করে আসছে।
- ভারত: বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে নিয়মিত সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন কমিশন অব ইন্ডিয়া একটি স্বাধীন সংস্থা হিসেবে পরিচালিত হয়।
- পাকিস্তান: পাকিস্তানের নির্বাচনী ব্যবস্থা সামরিক শাসনের প্রভাব ও গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার কারণে বিভিন্ন সময় পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করে।
- বাংলাদেশ: বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা প্রাথমিকভাবে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন হয়েছিল, তবে পরবর্তীতে বিভিন্ন সামরিক শাসন ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এভাবে ভারতীয় উপমহাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থার ইতিহাস একটি পরিবর্তনশীল এবং উন্নয়নশীল প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা যায়।